কেন লেখকের বই উৎসর্গ করার প্রয়োজন পড়ে?।। তালাশ তালুকদার


একজন কবি কিংবা লেখক বিভিন্ন কারণেই বই উৎসর্গ করে থাকে। প্রথমত, এটা হতে পারে, লেখকের কোনো প্রিয়জনের ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে রাখতে। কেউবা পলিটিক্যাল কারেক্টনেসকে ভালবেসে তার অগ্রজ গুরু শীর্ষস্থানীয় কাউকে খুশি করতে। যার থেকে সে শিখেছে জীবনের পথচলা। কেউ বা ফিন্যান্সিয়াল হেল্প পেয়েছে বলে তাকে উৎসর্গ করে। কার্ল মার্ক্সের দাস ক্যাপিটাল উৎসর্গ পত্র এভাবেই উৎসর্গত হয়েছে। মানে, তার বন্ধু টাকা দিয়ে হেল্প করেছিল বলেই মার্ক্স তার জীবনের সেরা লেখাটিই উৎসর্গ করেছিল।

আগের আমলে বইপত্র সাধারণত, দেব দেবীকে উৎসর্গ করে রচনা করা হচ্ছিল। প্রচুর ক্ষমতাবান যারা, মহান মানুষ তাদেরকেও উৎসর্গ করা হয়েছিল। গ্রীকের রাজনীতিবিদ অ্যারিস্টাইডিস নাকি বলেছিলেন, উপাসনালয় উৎসর্গিত হয় দেবতার উদ্দেশে আর বই উৎসর্গ করতে হয় মহান মানুষকে। এতেই বোঝা যায় সে সময়ে মানে ৪০০ খ্রিস্টপূর্বেও লেখকেরা বেছে বেছে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানদের বই উৎসর্গ করেছিলেন। তবে যেটাই হোক। একজন লেখকের সবচেয়ে আরাধ্য জিনিস হলো তার লেখা বই। সেই লেখা বই যখন কাউকে উৎসর্গ করে তাহলে বুঝে নিতে হবে লেখকের দৃষ্টিতে খুব পোটেনশিয়াল ব্যক্তিই সে ব্যক্তি। 

বই উৎসর্গ করার ধারাটি যে আমাদের ভারতবর্ষে আগে থেকেই চালু ছিল। ব্যাপারটি তা নয় অবশ্য। বই উৎসর্গ করার ধারাটিও পাশ্চাত্যের ধারা। এই ধারাটিকে বেশ পাকাপোক্তভাবে, একধরণের রীতিতে পরিণত করেছে মাইকেল মধুসুধন দত্ত এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায়। আমাদের এখানে এর আগে অনেকে বই উৎসর্গ করাটাকে অতোটা জরুরি মনে করতেন না। কিন্তু বই উৎসর্গ পত্রে নাম উল্লেখের পাশাপাশি লেখক যে উৎসর্গিত ব্যক্তি সম্পর্কে অনুভূতি প্রকাশ করেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ন হিসেবে ভাবা দরকার। কেননা যাকে উৎসর্গ করা হইতেছে বইটা, তার সাথে লেখকের এমন সম্পর্ক গভীর সম্পর্ক আছে বলেই তাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। অনেক সময় উৎসর্গ পত্র দেখেও লেখককে বুঝতে পারা যায়, সে লেখকটি কেমন। 

সাধারণত একজন লেখকের তার সবচেয়ে প্রিয়, কাছের মানুষটিকেই বই উৎসর্গ করে থাকে। মানুষের প্রিয় মানুষের তালিকা যেমন বদলে যায়, যেতে পারে তেমনই একটা বইয়ের উৎসর্গও বদলে যেতে পারে। সালমান রুশদির তার স্যাটানিক ভার্সেস বইয়ে এমনটা টের পাওয়া যায়। সালমান রুশদি এই বইটি প্রথমে উৎসর্গ করেছিল স্ত্রীকে। পরে রুশদি পলাতক হলে স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলে রুশদিকে এই বইটি প্রকাশে যারা সহযোগিতা করেছিলেন তাদেরকে পরে উৎসর্গ করেছিলেন। তার মানে উৎসর্গপত্রও বদলে যায় তার সময়ের পারস্পেকটিভে। ফলে, উৎসর্গ পত্র দেখেও সময়ের পরিক্রমায় একটা লেখকের মননে কি ঘটছে, ঘটেছে তার একধরণের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। অতএব উৎসর্গ পত্রের ব্যাপারটি একধরণের গুরুত্বের ব্যাপারই বলা যেতে পারে।

মন্তব্যসমূহ