নব্বই দশকি জীবন ।। তালাশ তালুকদার


মধ্যরাত
হলে কে শোনেননি শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক? কে দেখেননি অন্ধকার রাতে সারি সারি জোনাকিদের? হারিকেনের মিটমিটে আলোয় কে স্কুলের পড়া পড়েননি? আলুর জমিতে গরুর হাল জুড়িয়ে দিয়ে আলু কুড়ানোর জন্য চটের ব্যাগ হাতে কে ঘোরেনি গরুর হালের পিছে পিছে? কিংবা ধানকাটা হয়ে গেলে ধানের জমিতে ইঁদুরের গর্তে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে ইঁদুরের গর্তে নিয়ে যাওয়া ধান কে টেনে বের করেনি? ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর টর্চলাইট জ্বেলে নদীতে মাছ ধরতে যায়নি কে? দল বেঁধে নদীতে সাঁতার কাটা, হাডুডু খেলা, চোর, ডাকাত, পুলিশ খেলা কে খেলেনি?

অন্তত যারা আশির দশক ও নব্বই দশকের প্রথম ভাগে গ্রামে বড় হয়েছে, গ্রামে থেকেছে তাদের কাছে এমন দৃশ্য খুব চেনা হওয়ার কথা।

জি¦, আমি আশি কিংবা নব্বই দশকের কথাই বলছি।

বিশেষত আমরা যারা আশিতে জন্ম নিয়েছি এবং গ্রামে থেকেছি, তাদের কাছে তো এমন কত কিছু যে পরিচিত দৃশ্য, ঘটনা আছে, যা এরপরে অর্থাৎ বর্তমান সময়ে এসে আর দেখা যায়ই না প্রায়। এখন ভাবি, আমাদের আশি–নব্বই দশকের সময়টা কতটা সমৃদ্ধ ছিল, তা ভেবে ভেবে অবাকই হই।

শৈশবের সময়কাল তো শৈশবই। সেই তুমুল দিনগুলোর ওপর দাঁড়িয়েই মানুষ ধীরে ধীরে বড় হয়, শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ করে, যৌবন থেকে আবার বৃদ্ধও হয়। কিন্তু একেক সময়ের একেক রকমের অভিজ্ঞতা, একেক রকমের জীবনযাপনের পদ্ধতি স্থানকালপাত্রভেদে আলাদা রকমের হয়। একজন শহুরে তরুণের শৈশবের অভিজ্ঞতা এক রকমের আবার একজন গ্রামে বেড়ে ওঠা তরুণের শৈশবের অভিজ্ঞতা আরেক রকমের। ফলে এই যে জীবনকে দেখার, বোঝার ও শোনার অভিজ্ঞতা একেকজনের কাছে একেক রকমের হয়। মানুষের জীবন যে বৈচিত্র্যময়, এটা এই কারণেই হয় সম্ভবত। একজন আমেরিকানÑ ইউরোপিয়ান তরুণের শৈশব আর বাংলাদেশি আর্বানিস্ট তরুণের শৈশবের দেখার, বোঝার বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হবে। তেমনি একেবারে অজপাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা তরুণের শৈশবও হয় একেবারেই আলাদা।

সময় কীভাবে দ্রুত চলে যায়, যাচ্ছে, তা ভেবে অবাক হই। দ্রুত পুঁজির বিকাশের কারণে আজ থেকে ত্রিশ বছর আগের পাড়ি দেওয়া সময়টাকেও এখন বেশ অচেনা লাগে। আজকে গ্রামে গ্রামে ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ নাগরিক সুযোগ সুবিধার অনেক কিছুই গ্রামের মানুষের কাছে ধরাও দিয়েছে। অথচ আশির দশক কিংবা নব্বই দশকের শেষের দিকেও গ্রামের ভেতর দিয়ে কোনো মোটরসাইকেল যাওয়া মানে অনেক বড় ঘটনা। আজকের সময়ে এমন কথা বললে তো অনেকে ইউটোপিয়া ভাববে। অথচ সে সময় গ্রামের রাস্তা দিয়ে যাওয়া সেই মোটরসাইকেল দেখার জন্য বাড়ির ভেতর থেকে দৌঁড়ে বের হয়েছে ছেলেমেয়েরা। আমার এখনো স্মরণে আছে, হোন্ডা চলে যাওয়ার পর হোন্ডার ধোঁয়া শোঁকার জন্য মাটির ওপর নাক দিয়ে রাখত কচি কচি ছেলেমেয়েরা যাতে ডিজেলচালিত ধোঁয়ার ঘ্রাণ উপভোগ করতে পারে।

সে সময় গ্রামে ইলেকট্রিসিটি ছিল না। ফলে ঘর আলোকিত করার মাধ্যম হিসেবে হারিকেন, নয়তো চেরাগই ছিল ভরসা। আট আনা কিংবা এক টাকায় অনেক কেরোসিন তেল পাওয়া যেত, যা দিয়ে সারা রাত হারিকেন কিংবা চেরাগ জ্বালিয়ে রাখা যেত। ইলেকট্রিক ব্যবস্থা না থাকার দরুন টিভি–ফ্যান কিছুই ছিল না। অনেকের মনে থাকার কথা, আলিফ লায়লা, সিন্দাবাদ কিংবা বিশেষ কিছু টিভি সিরিয়াল দেখার জন্য কারও কারও বাড়িতে আগেই গিয়ে বসে থাকা লাগত। পরে গেলে বসার সিট পাওয়া যেত না। সবাই যে বসার সিট পেত, তা–ও না। টিভি মালিকেরা যাদেরকে সমমনা মনে করত, কেবল তাদেরকেই ঘরের ভেতর বসতে দিত। টিভি দেখতে এত লোকের সমাগম হতো যে টিভি বাড়ির উঠানে সেট করতে হতো। সে সময় সবার বাড়িতে টিভি থাকত না। পুরো গ্রাম মিলে দু–একটা অর্থনৈতিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী ফ্যামিলিতে টিভি থাকত শুধু। তা–ও আবার সাদাকালো টিভি। পরিষ্কার দেখা যেত না, সব সময় ঝিরঝির করত। অ্যানটেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে স্ক্রিন ক্লিয়ার করা লাগত। এর বাইরে জনসাধারণের বিনোদনের অন্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা সবার পক্ষে সম্ভব হতো না। গ্রামের আশপাশে কোনো সিনেমা দেখার কোনো হল ছিল। সিনেমা দেখতে হলে শহরে গিয়ে দেখতে হতো। শহরেও খুব বেশি হল ছিল না। এই সব হলে টিকিট আগেই ব্ল্যাকে বিক্রি হয়ে যেত। এ কারণে গ্রামের লোকেরা সেখানে গিয়ে খুব বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত না। এ ছাড়া হলগুলোতে টিকিট কাটতে গিয়ে মারপিট হতো। ফলে গ্রামের সহজ সরল উঠতি ছেলেদের পক্ষে মারপিট করে টিকিট কেটে সিনেমা দেখা বেশ কঠিনই হয়ে পড়ত। এ কারণে যারা গ্রামে থাকত, তারা রিলিজ হওয়া সিনেমাগুলো ভিসিআরে দেখত। সবাই মিলে চাঁদা তুলে ভিসিআর, টিভি ভাড়া করে আনা হতো। ব্যাটারি দিয়ে চালানো লাগত সেসব।

গ্রামেগঞ্জে বিভিন্ন উপলক্ষ করে মেলা বসত প্রায়ই। সে মেলাগুলোতে বড় বড় মিষ্টি পাওয়া যেত। সেসব মাছাকৃতি মিষ্টির একেকটার ওজন এক থেকে দেড়, দুই কেজি পর্যন্ত হতো। একটা মিষ্টি কিনলে চার–পাঁচজন মিলেও খাওয়া সম্ভব হতো না। যাত্রাপালা হতো। কী সুন্দর সেসব যাত্রা। দি রওশন সার্কাস, সোনার বাংলা সার্কাস—এসব দলের যাত্রা দেখার জন্য মানুষ সন্ধ্যার পর থেকে সারা রাত দেখে ভোরে ঘরে ফিরত। সার্কাসগুলোতে ঢাকা থেকে নায়ক–নায়িকাদের ভাড়া করে আনত। তাদের দেখার জন্যও লোকজনের ভিড় বাড়ত আরও। সেসব সার্কাসে বিভিন্ন ধরনের খেলা দেখানো হতো। সেসব মেলায় হোন্ডা খেলা থাকত। একটা কূপের ভেতর চতুষ্পার্শে হোন্ডা ঘুরত। হোন্ডাচালক সেই কূপের ভেতরেই ঘুরতে ঘুরতে কখনো কখনো হাত ছেড়ে দিয়ে কখনো হোন্ডার ওপরে শুয়ে হোন্ডা চালাতে দেখে আনন্দ পেতাম সঙ্গে সঙ্গে হোন্ডাচালকের একটু উনিশ–বিশ হলেই পরিণতি কী হবে, ভেবে বিস্ময়ে গা শিউরে উঠত। পরে জেনেছি, সবই অভ্যাস, সবই প্র্যাকটিস। অভ্যাস ও প্র্যাকটিসের ভেতর থাকলে সবকিছুই সম্ভব হয়ে উঠে এক সময়।

মেলায় চুড়ি ফিতার দোকান বসত। সেই দোকানগুলোতে যাবতীয় খেলনা পাওয়া যেত। ছেলেরা পিস্তল কিনত। পিস্তলগুলো ছিল টিনের। আংটাতে বারুদ দেওয়া লাগত। তর্জনীতে টিগারে চাপ দিলেই বারুদ ফুটে ধোঁয়া উড়ত, সঙ্গে সঙ্গে আওয়াজও হতো। আরেকটা প্রিয় খেলনা ছিল, সেই খেলনার নাম টমটম গাড়ি। কোথাও কোথাও বিশেষত বগুড়া অঞ্চলে এই গাড়িটি ডড্ডোরি নামে ডাকা হতো। অদ্ভুত সেই গাড়ি। দড়ি ধরে টেনে নিয়ে গেলে গাড়ির পেছনে নিজ গরজেই বাজনা বাজত। আরও কত খেলনা ছিল, সেসব না পেলে মাটিতে গড়াগড়ি খেত শিশুরা। বাধ্য হয়ে কিনে দিতে বাধ্য হতো পিতা–মাতারা।

শৈশবে অনেকে ঘুড়ি ওড়ানো পছন্দ করত। উন্মুক্ত মাঠে কিংবা ফসলতোলা জমির ভেতর বসে নানা প্রকারের ঘুড়ি, চং উড়াত কিশোর–কিশোরীরা। অনেকে মার্বেল খেলত। মনে পড়ে মার্বেল খেলে কৌটা ভরে রাখতাম। এ ছাড়া ম্যাচবাক্সের কভার দিয়ে তাকে সেসব কভারগুলোকে ১০০, ২০০ টাকা বানিয়ে খেলতাম। বউচি খেলতাম। সাইকেলের পুরোনা টায়ারকে চাকা বানিয়ে একটা কঞ্চি দিয়ে তাকে তেড়ে নিয়ে যেতাম আর তার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও দৌড়াতাম। আরেকটা গাড়ি বানাতাম। সেই গাড়ির নাম হলো তিন চাকার গাড়ি। তিনটা বেয়ারিংই ছিল এর চাকা। এই বেয়ারিংয়ের গাড়ির ওপর বসে পেছন থেকে কাউকে ঠেলা দিতে হতো। ঠেলা দিলে গাড়ি চলত। আমরা অষ, কষ, সিঙ্গারা, বুলবুলি, মসকট খেলতাম। কলার পাতা দিয়ে ঘর বানিয়ে খেলাঘর তৈরি করতাম। সেইখানে ছোট হেঁশেল বানিয়ে ছোট ছোট পাতিলে বালু রান্না করতাম। মিছেমিছেই সবজি বানাতাম। সেসব মুখে না দিয়েই মুখ নেড়ে নেড়ে খাওয়ার ভঙ্গি করে খাওয়া শেষ করতাম। বউ, স্বামী খেলতাম। মেয়েরা বউ হতো, ছেলেরা স্বামী হতো। একটা সংসার করতাম। অবশ্য মাগরিবের আজান দিলেই সেই সংসার ভেঙে আসল ঘরে আসা লাগত।

শৈশব মানেই হলো নির্ভার হয়ে থাকা। মাথায় অর্থনীতির বোঝা নেই। সংসার চালানোর দায় নেই। বোঝাপড়ার হিসাব নেই। লোভ, হিংসা কিংবা লালসার জায়গা নেই। ফলে এখানে কে ব্রাক্ষ্মণ, কে মুচি, কে তালুকদার, কে প্রামাণিক—সেসবের কোনো বালাই নেই। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বাড়িতেই গিয়েছে, থেকেছে, একসঙ্গে খেলাধুলা করেছে।

আমাদের সময়ে অর্থাৎ শৈশবের সময়ে কারও বিয়ের অনুষ্ঠান হলে বিয়ের দুই–তিন দিন আগে থেকে বিয়েবাড়িতে ধুম পড়ে যেত। বিয়ের আগের দুই–তিন রাত আগে থেকেই বাড়িতে গীত গাওয়া হতো। কারও বাড়িতে গীত গাওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেলেই বোঝা যেত তাদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন চলছে। পাড়ার যে সমস্ত ভাবি, চাচি ভালো গীত গাইতে পারত, ভালো নাচতে পারত, তাদের বিয়েতে গীত গাওয়ার জন্য আগে থেকেই বলে আসা লাগত। তাদের জন্য পান–সুপারির ব্যবস্থা করা লাগত। তারা মুখ পুরে পান খেত আর গীত গাইত। কখনো কখনো মাথায় কাপড় দিয়ে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে নাচত। এই গীত গাওয়া এবং নাচা প্রায় মধ্যরাত অবধি চলত। কখনো কখনো মধ্যরাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত চলত।

বিয়েগুলোতে বর্তমান সময়ের মতো চাকচিক্য আর আভিজাত্যের ছোঁয়া ছিল না। বিয়েতে যাওয়ার জন্য বরযাত্রীর যানবাহন হিসেবে মার্সিডিজ, রোলাক্স কিংবা বড় বড় বাস ছিল না। সে সময়ে যানবাহন হিসেবে দেখা যেত বেবিট্যাক্সি। বেবিট্যাক্সিই সে সময়কার অ্যারোস্ট্রোক্র্যাটদের যানবাহনে ব্যবহৃত হতো। যারা নিম্নবৃত্ত ছিল তারা ব্যবহার করত ভ্যানগাড়ি, কিংবা সর্বোচ্চ পায়ে ঠেলা রিকশা। আমার খুবই মনে আছে, বিয়ের পর পাঁচ কুটুমের সময়ে বিবাহিত বউকে রিকশায় করে আনত। এবং সে রিকশা কখনোই উন্মুক্ত ছিল না। হুড তুলে দেওয়া তো থাকতই, এর সঙ্গে দশ হাতের শাড়ি দিয়ে রিকশার সম্মুখভাগ প্যাঁচানো থাকত। যাতে কেউ নতুন বউয়ের মুখদর্শন করতে না পারে। বাড়িতে নতুন বউ এলে, পাড়ার সবাই দল বেঁধে আসত নতুন বউ দেখতে। হায়, সেসব সংস্কৃতি এখন কোথায়? কোথায় আমাদের শৈশবের সময়। শৈশবের রঙিন দিন। মনে পড়ে, খুব মনে পড়ে।

যে একটা পরিত্যক্ত টিন কিংবা পরিত্যক্ত লোহার বিনিময়ে লই কিংবা বাদাম কিনে খায় নাই সেও আসলে শৈশবের আসল মজাটাই পায় নি। লইওয়ালা কিংবা বাদামওয়ালা যখন রাস্তা দিয়ে  যাইতে যাইতে এ বার‌্যা... লই..  বলে হাঁক দিতো তখন অধিকাংশ তরুণের ভেতরেই লই কিংবা বাদাম খাওয়ার জন্য ভেতরটা ছটফট করতো। মানে সেসব লই কিংবা বাদাম কোনো পরিত্যক্ত জিনিসের বিনিময়ে না কেনা পর্যন্ত ছটফটানি কিংবা ছাটা থামতো না। আমরা অনেকে জমিতে কুড়ানো আলু, মরিচ কিংবা ইদুরের গর্ত থেকে কুড়ানো ধান ঘরে রেখে দিতাম সেসব চটকদার খাবার কিনে খাওয়ার জন্য। যখন রাস্তার পাশ দিয়ে সাইকেলে করে আইসক্রিমওয়ালা কিংবা ভাড়ে করে লই বিক্রেতা হাক ছাড়তো আমাদের কুড়িয়ে রাখা সেসব (আলু, মরিচ কিংবা ধান) দিয়ে কিনে খেতাম। 

আমাদের গ্রাম কৃষিনির্ভর হওয়ার কারণে গ্রামের অধিকাংশ মানুষদেরকেই দেখেছি তারা শহরে খুব একটা যেতোনা। যারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করতো এইসব গ্রামের লোকেরা তাদের কাছ থেকেই জিনিসপত্র কিনতো। বিশেষত নারীরা কিনতো বেশি। গ্রামের অধিকাংশ নারীরাই ভ্যান কিংবা সাইকেলের পিছনে ক্যারিয়ার করে কাপড় বিক্রি করতে আসা লোকেদের কাছ থেকে দলবেঁধে কাপড় কিনে নিতো। তাদের পছন্দমতো কেউ কিনতো শাড়ি, কেউ কিনতো ব্লাউজ, পেটিকোটের কাপড়। এই সমস্ত কেনা কাপড়গুলো আবার স্থানীয় দর্জিদের মাধ্যমে সেলাই করে নিতো। এই দর্জিগুলো পায়ে প্যালা মেশিন দিয়ে পোষাক বানিয়ে দিতো। শুধু তাই নয় গ্রামের বধুরা নিজেদের অনেক কাজ নিজেরাই করতে পারতো। বিশেষ করে গ্রামের প্রত্যেক বউঝিরাই কাঁথা তৈরি করতে পারতো। আমরা দেখেছি, সেসব কাঁথা কেউ গাছের ছায়ায় বসে কিংবা বাড়ির গেটে বসে বসে সেলাই করতো। তারা কাঁথা সেলাই করতো আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের সংসারের সুখ দুঃখ, আনন্দ, বেদনাগুলো পরস্পরের সাথে ভাগ করে নিতো।

গ্রামে মানুষদের কর্মসংস্থান খুবই কম। নাই বললেই চলে। একারণে তাদের অভাব, অভিযোগ, দুঃখ দুর্দশারও অন্ত থাকেনা। গ্রামের মানুষেরা জীবন জীবিকা নির্বাহ করে মূলত, কৃষির উপর ভিত্তি করে। যাদের একটু জমিজমা আছে তারাই আসল গার্হস্থ্য। বাকিরা সেসমস্ত গার্হস্থ্যদের বাড়িতে কেউ জায়গীর থেকে, কেউ কামলা দিয়ে কিছু পয়সা পায়। বাকিরা কেউ গরু কিংবা ছাগল পালে। সকাল হলেই সেসব গরু, ছাগলগুলোকে নিয়ে মেঠোপথ ধরে দুরের জমিতে খুঁটিতে বেঁধে আসতো ঘাস খাওয়ানোর জন্য। গরু ছাগলদের ঘাস খাওয়া শেষ হলে আবার বাড়িতে নিয়ে আসতো। তাদের সময়গুলো গরু, ছাগলদের সাথে সাথেই কাটে মূলত। এছাড়াও প্রত্যেক বাড়িতেই মায়েরা হাঁস মুরগী লালন পালন করে। এই হাঁসমুরগী পালার জন্য বাড়ির মালিক ঘড়া বানাতো। হাঁস মুরগীর থাকার জায়গাকে অর্থ্যাৎ ঘরকে ঘড়া বলে লোকেরা। (ঘড়া শব্দটি সাধারণত বগুড়া তথা উত্তরাঞ্চলের ভাষা।) সব দেশি জাতের মোরগ, মুরগী কিংবা হাঁস পালন করে।

বর্তমান সময়ের মতো হাইব্রীড জাতের মুরগী ছিলনা। সব কিছুই দেশি ছিল সেসময়। দেশি মুরগী। লাল গমের আটা। লাল চাল। লাল চিনি। মিষ্টি আলু (শ্যাখা আলু বগুড়ার স্থানীয় ভাষা), ফর্মালিন মুক্ত গাছপাকা কলা, পুকুরের মাছ, শাক সবজি কিংবা ফল। অর্থ্যাৎ সবকিছুই অর্গানিক ওয়েতে উৎপাদিত হতো। আমার এখনো মনে পড়ে, আমরা যখন কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, মুরগীর ঘড়া থেকে টাটকা মুরগী টেনে এনে জবাই করে রান্না করে খাওয়াতো আত্মীয় স্বজনেরা। সে খাবার কত যে স্বাদ ছিল। এখন সেসব কথা মনে হলে মনে হয়, এর চেয়ে তৃপ্তিকর খাবার আর কি হয়?

সারারাত বোরো চালের ভাত পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই ভাত অর্থ্যাৎ মরিচ, পেয়াজ দিয়ে পান্তাভাত করে খাওয়াটা যে কতটা তৃপ্তি দেয় তা বলে বোঝানোর মত নয়। এখন পহেলা বৈশাখে যে ঘটা করে বাঙালীরা পান্তাভাত খায় সে সময় তা ছিলনা। সেসময় কৃষকদের বাড়িতে পান্তাভাত খাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা ছিল। পরে জেনেছি, সেই পান্তাভাতেও নাকি প্রচুর রয়েছে পুষ্টিগুণ। যাই হোক সে সময় মানুষেরা খেয়েছে মূলত ক্ষুধা নিবারণের জন্যই। এছাড়া অনেক মানুষকেই দেখেছি সকালে রাতের বাসী ভাত খেতে। অনেকে এই ভাতটাকে কর্করা নামেও ডাকে। তো এই ভাতটা যদি তুলনামুলক ভাতের চেয়ে একটু নরম হয়ে যায় তখন এই নরম ভাতটাকে লাল মরিচ কিংবা কাঁচা মরিচ টুকরো টুকরো করে কেটে সাথে পেয়াজ, রসুন ফালি ফালি করে, একটু লবণ আর সরিষার তেল দিয়ে ভাত মাখানোটাকেই ভাতমাখা বলে। আবার কাউকে কাউকে হাঁড়িতে অবশিষ্ট থাকা ভাতটাকে ভেজে খেতে দেখেছি। ভাতভাজির সংস্কৃতিটা মনে হয় এখনো চালু আছে সমাজে।

কিছু অংশ প্রথম আলোতে প্রকাশিত


মন্তব্যসমূহ