ভাষাকে আমি গণতান্ত্রিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অস্ত্র মনে করি -মোহাম্মাদ আজম


মোহাম্মাদ আজম এবং তালাশ তালুকদার

আরসি মজুমদার মিলনায়তন, ঢাবি।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সেমিনারে। 

তালাশ তালুকদারঃ গোটা ভারত উপমহাদেশে এক উর্দু বাদে বাংলার মতো মিশ্রভাষা আর কোন ভাষাতে নেই। আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় দপ্তর পর্যন্ত সবখানেই এই মিশ্রভাষার অবাধ প্রবহমানতা কিংবা অন্তরঙ্গতা আমাদের ভাবিত করে তোলে। বাঙালীর যে পরিচয়, অর্থাৎ কৃষিজীবিজাত, সেখানেও হুট করে ঢুকে পড়ে আরবি, ফারসি নয়তো ইংরেজি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হয় যেখানে সেখানেও অর্থাৎ অফিস আদালতেও আগাগোড়া মিশ্রভাষার প্রচলন। অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যেক পদক্ষেপেই আমদের মিশ্রভাষার মুখোমুখি হতে হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সর্বোচ্চ চূড়া বাংলা একাডেমি-র যে বাংলা অভিধান সেখানেও স্পষ্ট দিক নির্দেশনা না থাকার দরুন এ প্রজন্মে এসেও বাংলা ভাষা বিপর্যস্ত এবং পূর্বসূত্রতা ধরে বিপথগামিতার পথ ক্রমেই বাঙালী জাতিকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করে তুলছে সংকর জাতি রূপে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

মোহাম্মাদ আজমঃ এই বক্তব্য এতই তালগোল পাকানো যে এ সম্বন্ধে কিছু না বলাই ভালো। ভাষামাত্রই সংকর। বিশুদ্ধ ভাষার ধারণা শুধু ভাষা-সংক্রান্ত কুসংস্কারই নয়, হাস্যকরও বটে। আপনি বাংলা আর উর্দুর কথা বলেছেন। এ তালিকায় হিন্দি বাদ পড়ল কেন? আর আমাদের এত সাধের ইংরেজি? ইংরেজির কত ভাগ শব্দ ফরাসি থেকে আসা, তার হিসাব নিলেই বোঝা যাবে, ভাষার শুদ্ধতা-সম্পর্কিত বোলচালগুলো কি ভয়াবহ রকমে বাজে আর অকাজের। তবে হ্যাঁ, একটা বিশেষ সময়ে কোনো বিশেষ ভাষার ব্যবহারকারীরা ভাষার কিছু বিধিবিধান স্থির করে নেয়, এবং তা মেনে চলাকে শুদ্ধতার মাপকাঠি বলে গণ্য করে। ব্যবহার-উপযোগিতার দিক থেকে এটা দোষের কিছু নয়। দোষ হয় তখনই যখন এই ধরনের বিধিবদ্ধতাকে কেউ চিরকালীন জ্ঞান করে আর তা হুবহু সংরক্ষণের দাবি করে। ভাষার ক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় মৌলবাদ আর কিছু হতে পারে না। 

তালাশ তালুকদারঃ ১৩০১ বাঙলা অব্দে প্রকাশিত হয় ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’; এবং তখন থেকেই সত্যিকার অর্থে বাঙলা ভাষাতত্ত্বচর্চার সূত্রপাত ঘটে। এ বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদের উদ্যোগে বাঙলা ভাষা-উৎসাহীদের হাতে রচিত হতে থাকে বাঙলা ভাষার বহুমুখী ও অভিনব বর্ণনাবিশ্লেষণ ব্যাখ্যা। তবে এর ভেতরেই পুরোনোপন্থী একটি লঘু ভাষাতাত্ত্বিক গোত্র অভিযোগ করে বাঙলা স্বতন্ত্র নয়, তা ‘সংস্কৃতেরই কথিতাকার’। আসলে বাঙলা কি সত্যিই ‘সংস্কৃতেরই কথিতাকার’? এ সম্পর্কে বিস্তারিত যদি কিছু জানাতেন?

মোহাম্মাদ আজমঃ বাংলার সাথে সংস্কৃতের সম্পর্ক নিয়ে এত চমৎকার সব কথাবার্তা হয়ে গেছে যে আমার মতো আনাড়ির আর কথা বাড়াবার দরকার নাই। শ্যামাচরণ গাঙ্গুলির ‘বেঙ্গলি স্পোকেন এন্ড রিটেন’, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষা-বিষয়ক রচনা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি বই, এবং এমনকি সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘অরিজিন এন্ড ডেভেলপমেন্ট অব বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রভৃতিতে হালকা করে চোখ বুলিয়ে গেলেও ব্যাপারটা যে কারো কাছে খোলাসা হয়ে যাবে। আপনি যদি ভাষা আলোচনা ও ব্যাখ্যা করতে চান, তাহলে সংস্কৃত আপনার জন্য মোটেই জরুরি নয়। কিন্তু আপনি যদি ভাষা বা ভাষাবিজ্ঞানের নামে অন্য কিছু করতে চান, তাহলে সংস্কৃত কেন আরো নানা কিছুর দুয়ারে যেতে পারেন। আসলে পৃথিবীতে তো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের কোনো অভাব নাই, মানুষের ধান্দার রকমফেরেরও কমতি নাই।  

আমি এই সম্পর্কিত ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছি, সংস্কৃতের সাথে বাংলার সম্পর্ক বা নিকটাত্মীয়তা নিয়ে যাঁরা সময় খরচা করেছেন, তাঁদের মূল ঝোঁক – সবচেয়ে সাধু হলে – ভাষার আভিজাত্যের দিকে, মানে সংকীর্ণ গোষ্ঠীচেতনার দিকে, আর – খারাপ হলে – হিন্দুত্বের বা আর্যামির সাথে যুক্ত। বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের পরিমাণ অনেক বেশি। কিন্তু ইংরেজিতে ফরাসি শব্দ যা আছে, তার চেয়েও নিশ্চয় বেশি না। ইংরেজি ব্যাকরণবিদরা ভাষা-বিশে¬ষণে কয়বার ফরাসির নাম নেয়? সংস্কৃত সম্পদশালী আর বাংলার সাথে ঐতিহাসিকভাবে সংশি¬ষ্ট। ফলে সংস্কৃত ভাষাকে আমরা ব্যবহার করব – যতটা কাজে খাটানো যায়। তা না করে সংস্কৃত দ্বারা ব্যবহৃত হওয়া বা এর গোলামি করা নিশ্চয়ই যে কোনো দৃষ্টিতে বেওকুফি। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলা ভাষার কুতুবদের মধ্যে এই ধরনের বেওকুফের কোনো অভাব নাই। 

তালাশ তালুকদারঃ অধিকাংশ দেশের রাজধানী-কেন্দ্রিক আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষা, সংস্কৃতি, সভ্যতার বাহন রূপে কাজ করে। যেমন, ইংল্যান্ডে লন্ডনের ভাষা, ফ্রান্সে প্যারিসের ভাষা, জার্মানিতে বার্লিনের ভাষা। তাহলে এখন প্রশ্ন এ সময়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভাষা কি রাজধানী-কেন্দ্রিক অর্থাৎ ঢাকাইয়া ভাষাতে পরিচালিত হবে?

মোহাম্মাদ আজমঃ ঢাকাইয়া ভাষা’ কথাটার ব্যাপারে খুব সাবধান থাকা দরকার। ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হওয়ার পর থেকে পুরা বাংলাদেশ থেকে মানুষ এসে এখানে জড়ো হয়েছে। এরা এখন ঢাকার মানুষ। কিন্তু এরও আগে থেকে এখানে যারা বাস করত, তাদের ভাষারও কিছু সুস্পষ্ট আলাদা ধাঁচ আছে। আমি যদ্দুর বুঝি, যাঁরা ঢাকার ভাষার কথা বলেন, তাঁরা এই শেষেরটার কথা বলেন না, প্রথমটার কথাই বলেন। যদিও প্রথমটাতে দ্বিতীয়টার কিছু শেয়ার তো অবশ্যই আছে। 

আপনি যা বলেছেন তাতে মনে হয় আপনি প্রমিত বা মানভাষার কথা বলতে চাইতেছেন। প্রমিত ভাষার সঙ্গে কোনো দেশের – সাধারণত রাজধানীর – অভিজাত ও ক্ষমতাবান অংশের কথ্যভাষা যুক্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই হওয়া উচিত। 

এখানে বলে রাখি, রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরী কোনো-না-কোনোভাবে রাজধানীকেন্দ্রিক ভাষাকে ভিত্তি ধরে মান ভাষা নির্ধারণের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তাঁদের মূল যুক্তি হল, রাজধানীতে নানা অঞ্চলের মানুষ এসে জড়ো হয় বলে এর ভাষায় একটা গণতান্ত্রিকতা থাকে। মানে দশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। 

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মহারথীদের মত মেনে না নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। 

তালাশ তালুকদারঃ সর্বজন স্বীকৃত উচ্চারণ ইংল্যান্ডে কথিত জবপবরাবফ চৎড়হঁহপরধঃরড়হ বা গ্রীসের ‘কোইনি’ ভাষার মত সমগ্র শিক্ষা, সংস্কৃতির সভ্যতায় ব্যবহৃত। যেখানে ইংল্যান্ডে কথিত জবপবরাবফ চৎড়হঁহপরধঃরড়হ বা গ্রীসের ‘কোইনি’ ভাষা সেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন ভাষাটাকে উপযুক্ত মনে করেন?

মোহাম্মাদ আজমঃ সর্বজনস্বীকৃত উচ্চারণ বলতে আদতে কিছুই নাই। আছে রাষ্ট্রের বা সমাজের ক্ষমতাবান এলিটদের উচ্চারণকে মান উচ্চারণ বলে বিধিবদ্ধ করা। পৃথিবীর সব দেশে এই বস্তুই হয়ে আসছে। এতে কাজকারবারের সুবিধা হয়। ভাষার আনুষ্ঠানিক নানা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বিভিন্ন রূপজনিত সংকট থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এটা পরিষ্কারভাবে একটা প্রায়োগিক সুবিধার মামলা। ভাষার পবিত্রতা বা শুদ্ধতা রক্ষার মতো ‘ধর্মীয়’ কোনো ব্যাপার না। 

বাংলাদেশের মান উচ্চারণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটার কোনো কারণ দেখছি না। কিন্তু হয়েছে। আমাদের মান উচ্চারণে ঢাকার উচ্চারণকে একেবারেই আমলে আনা হয় নাই। ফলে আসলে এটা মান উচ্চারণ হয় নাই। এই কাজ এখনো বাকি আছে। 

আরেকটা কথা। ইংরেজির মতো একটা আন্তর্জাতিক ভাষার ক্ষেত্রে – অর্থাৎ যে ভাষা ভিন্নভাষীরা বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করে – বিধিবদ্ধতার যে সুযোগ, জরুরত আর ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতা, তা বাংলার মতো একটি প্রান্তীয় ভাষার ক্ষেত্রে মোটেই নাই। ব্যবহারিক দিক থেকে বাংলা ভাষার বিধিবদ্ধকরণের ক্ষেত্রে বাংলাভাষীদের কথা মাথায় রাখাই যথেষ্ট। 

তালাশ তালুকদারঃ বিশ্বভাষা সমাজে প্রবেশ করতে চাইলে শুধু মানভাষাকেই ভাষার চরম সার্থকতা বিচার করবেন?

মোহাম্মাদ আজমঃ এই প্রশ্নটি ঠিক মতন বুঝি নাই। আপনি বোধ হয় বলতে চাইছেন, বাংলা বিশ্বমানের ভাষা হবে বা এ জাতীয় কিছু একটা। আসলে বিশ্বমানের ভাষা বলে তো কিছু নাই। বা উন্নত-অবনত কথাগুলোও ভাষার ক্ষেত্রে সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। আসল কথা হল, একটা ভাষার ব্যবহার কতটা বিস্তৃত। আর অন্যভাষীরা নানা দরকারে ঐ ভাষার কাছে হাত পাতে কিনা। মানে এই ভাষার খোঁজখবর করতে হয় কিনা। তো, এই ঘটনা তো মান ভাষা বা আঞ্চলিক ভাষার মামলা না। সব কাজে ভাষা ব্যবহারের মামলা। 

আর আপনার প্রশ্নের টোন সম্পর্কে অনুমান করে বলতেছি – মান ভাষার কোনো সংকীর্ণ ধারণা দিয়ে সব ধরনের কাজের জন্য ভাষাকে উপযোগী করে তোলা সম্ভব নয়। বড় জোর চিবিয়ে কথা বলা যেতে পারে। 

তালাশ তালুকদারঃ গত দু’শতকে কৃষিসমাজের বহু অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাবৈচিত্র্যের ভেতর থেকে আহরিত করা হয়েছে আধুনিক সমাজের মানভাষা। সে ভাষা সম্পর্কে কিছু বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ আপনি তাজ্জব করলেন। গত দুশতকে গড়ে ওঠা মানভাষা সম্পর্কে এই কথা প্রথম শুনলাম। পয়লা বার শুনলেই যে তাজ্জব হতে হবে এমন না। তাজ্জব হওয়ার কারণ হল, এই ব্যাপারে মোটামুটি সবাই উলটা কথা বলে। বলা হয়, বাংলা মান ভাষা আঞ্চলিক বা বৃত্তিজীবীদের দান থেকে চিরবঞ্চিত। বলা হয়, এই ভাষা মুখ থেকে কলমে আসে নাই। বরং কলম থেকে মুখে এসেছে। তাই এর কৃত্রিমতা রয়েই গেছে। 

তবে হ্যাঁ, প্রধানত সাহিত্যের ভাষা এর ব্যতিক্রম। সাহিত্যিকদের যেহেতু ‘মানভাষা’ ব্যবহার করতে বাধ্য করার কোনো স্বীকৃত তরিকা নাই, আর সাহিত্য করার কামটাই এমন যে কোন শব্দ বা প্রকাশভঙ্গির দরকার হয়ে পড়বে তা আগেভাগে ঠিক করা থাকে না, তাই সাহিত্যের ক্ষেত্রে আপনার দাবি অংশত ঠিক বলেই মনে হয়। 

তালাশ তালুকদারঃ আঞ্চলিক ভাষা কি প্রচলিত সাহিত্যের ভাষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করে?

মোহাম্মাদ আজমঃ এই প্রশ্নটাও পরিষ্কার না। সাহিত্যে আঞ্চলিক ভাষা তো চিরকাল ব্যবহৃত হয়ে আসতেছে। কই, কাউকে তো এই ব্যাপারে আপত্তি করতে দেখিনি। বরং বাংলা সাহিত্যের প্রভাবশালী বয়ানে এই বস্তুর প্রশংসাই তো শুনতেছি। 

আপনি বোধ হয় বলতে চাচ্ছেন, আঞ্চলিক ভাষাকে মান ভাষার বদলে ব্যবহার করলে ক্ষতি হয় কিনা? নাকি? যদি তাই হয়, তাহলে বলতে পারি, সাহিত্যের ক্ষেত্রে এমন মাস্তান কে আছে, যে আগেভাগে এ বিষয়ে কোনো ফতোয়া দিতে যাবে? সাহিত্যে ভাষার ব্যবহার ঠিক হইল কিনা, তা বলার তো একটাই উপায় – সাহিত্যটা হইল কিনা তা বিচরাইয়া দেখা। আগেভাগে সাহিত্যের ভাষা নিয়া ফতোয়া দেওয়ার মূর্খতা আমি কেন করতে যাব? 

তালাশ তালুকদারঃ নবাবি আমলের কবি ভারতচন্দ্রের সাক্ষ্য এই, তার নবাবি আমলে বাংলায় ছিল বিলেতি জাতির বসবাস। অর্থাৎ সে সময়কালে ফিরিঙ্গি, আলেমান, ওলন্দাজ, দিনেমার ও ইংরেজরা এ অঞ্চলের সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এবং তাদের মুখের কিছু কিছু বিলেতি কথা গলাধঃকরণ করেছিল বাংলাভাষা। সেই উইপোকা এখনো বাঙালি জাতির মস্তিষ্কে‹র ভেতর যত্রতত্র তালগোল পাকিয়ে দেয়। বাংলার ভদ্র সমাজের কথা কর্ণপাত করলেই বোঝা যায় যে, তাদের মৌখিক ভাষার বিশেষ্য বিশেষণ বেশির ভাগই বিদেশি তার ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম শুধু বাংলা। এ সম্পর্কে কিছু বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ এ সম্পর্কে আগে একবার বলেছি। এই প্রশ্নের মধ্যেও ভাষার শুদ্ধতা সম্পর্কে এমন এক অনুমান আছে যে, অন্য ভাষার শব্দ মিশলে ভাষা দূষিত হয়। ভাষা সম্পর্কে এর চেয়ে বড় কিন্তু চালু কুসংস্কার আর হতে পারে না। ভাষা ইতিহাসের সব কালেই অন্য ভাষা থেকে শব্দ কর্জ করেছে। কিন্তু ব্যাকরণ নয়। বস্তুত বিপুল পরিমাণ শব্দ ধার করেও ঋণী ভাষা ঐ ভাষাই থাকে, অন্য ভাষা হয়ে যায় না। আরবি-ফারসি সম্পর্কে উনিশ শতকে এই কুসংস্কার খুবই প্রবল ছিল। আর এ থেকে বাংলাকে ‘কুমারী’ রাখতে গিয়ে লেখ্য বাংলার উপর যথেষ্ট বলাৎকার হয়েছে। 

তবে হ্যাঁ, পারস্পরিক মেলামেশা আর দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এক ভাষার শব্দ আরেক ভাষায় ঢুকে পড়া, আর হেড়ম দেখানোর জন্য খিঁচুড়ি ভাষা ব্যবহার – এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক আছে। এই দুইকে এক করে দেখলে চলবে না। উদাহরণ দিচ্ছি – কম্পিউটার বা টাইপ বাঙালি ব্যবহার করে দরকারে। ফলে এই দুইটা বাংলা শব্দ। কিন্তু ‘লিসেনার’ বা ‘ভিয়্যুয়ার’ বাংলা নয়। এর সাথে দেমাকের একটা সম্পর্ক আছে। এখন এই দেমাকওয়ালারা যদি জনগোষ্ঠীর প্রভাবশালী আর গরিষ্ঠ অংশ হয়, তাহলে এই জিনিস চলবে। আর যদি দুই-চারটা কিল-ঘুষি রাস্তাঘাটে খাইয়া যায়, তাহলে এই চিজ বন্ধ হয়ে যাবে। 

মনে রাখতে হবে, শুদ্ধতা-বিশুদ্ধতা দিয়ে এই বিচার চলবে না। আর ভাষা-আন্দোলনের বরাত দিয়া এইসব ফায়সালা করতে যাওয়া স্রেফ বোকামি। এই রোগ এসছে তথাকথিত ইংরেজি মিডিয়ামের আধিপত্য থেকে। ইংরেজির আধিপত্য থেকে। আপনি এইসব রাষ্ট্রবিরোধী কাজের মদদ দিবেন, আর ইংরেজি-বাংলা মিশাইতে দিবেন না – এইসব হাস্যকর কথা কেবল বাংলাদেশেই চলতে পারে। যে পোলাপাইন এ লেভেল বা ও লেভেলের জন্য পড়াশুনা করে, বা যে ছেলেমেয়েগুলা ছোটবেলা থেকে শুইনা আসতেছে, ইংরেজি না শিখলে কোনো পড়াশুনাই কামে লাগে না, তাদের এইরকম মিশ্রভাষী না হওয়াটাই বরং বিস্ময়কর। আপনি লেখাপড়ার ভাষা বাংলা করেন, আদালত আর অফিসের ভাষা বাংলা করেন, ইংরেজিরে এক নম্বর ভাষা না কইরা সহায়ক ভাষা হিসাবে পদ্ধতিগতভাবে গুরুত্ব দিয়া পড়ানোর ব্যবস্থা করেন, দেখবেন ইংরেজি-বাংলা মিশ্র ঢং দুইদিনে কমে যাবে। তা না কইরা একুশের বরাত দিয়া গলা ফাটানো নিছক একটা আজাইরা প্যাচাল – কাজের কিছু না।  

তালাশ তালুকদারঃ সব ভাষাই আঞ্চলিক ভাষা এ সম্পর্কে কিছু বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ সব ভাষা আঞ্চলিক ভাষা নয়। কেন্দ্র-প্রান্ত ভেদ যখন আছে, তখন ‘আঞ্চলিক’ নামের অপরও আছে এবং থাকবে। 

বরং ভাষাবিজ্ঞান শাস্ত্রে যেভাবে একটি ভাষার সবগুলো রূপকে উপভাষা বলা হয়, তা বললেই সুবিধা। এই নিক্তিতে ‘প্রমিত’ বা ‘মান’ ভাষাও একটি উপভাষা বটে। কথাটা আরেকটু বাড়ালে হিসাবটা পরিষ্কার হয় – মানভাষা হল কোনো ভাষার সেই উপভাষা, যা আধিপত্যের লড়াইয়ে জিতে গেছে; আর আঞ্চলিক ভাষা হল হারু পাট্টি – হেরে যাওয়া ভাষা। 

আরেকটা কথা, আঞ্চলিক ভাষা কিন্তু ভাষাবিজ্ঞানের চোখে ‘অপূর্ণ’ বা ‘দুর্বল’ কোনো উপভাষা নয়। রাজনৈতিক ও অপরাপর ক্ষমতায়ন ঘটলে কিংবা কোনো কারণে দশের চোখে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হতে থাকলে যে কোনো আঞ্চলিক ভাষাও ‘অত্যাচারী প্রমিত’ ভাষা হয়ে উঠতে পারে। 

তালাশ তালুকদারঃ বাংলা সাহিত্যের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারে অনেক সময় পাঠকদের বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। যেমন ধরুন, ‘আকালি’ শব্দটি। এটি রংপুর জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্নবৃত্তের মুখের ভাষা। এখন তৎসংলগ্ন অঞ্চলের বাইরের মানুষ যারা তারা উক্ত শব্দটির অর্থ নিশ্চিতভাবেই নিম্নবৃত্ত অঞ্চলের কোনো ‘মেয়ে’ কিংবা ‘মহিলা’ হিসেবে ভাববে, নয়তো কোনো কিছুই অর্থ খুঁজে না পেয়ে চুপ র’বে। আবার অনেক সময় দেখা যায়, বিদ্যালঙ্কার মহাশয় যখন বলেন, ‘বাক্য কহা বড় কঠিন’ অথবা মুজিবের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ‘ভায়েরা আমার’ কিংবা ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ শব্দগুলি বা বাক্যগুলি সর্বজনীন বোধগম্যতা পায়। তেমনি সর্বজনীন হয়ে ওঠার বিষয়টা একটু সাফ করে বলুন? অথবা কোন ভাষাটা সর্বজনীন হয়ে ওঠে এ বিষয়ে বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ ভাষা কখনো সার্বজনীন হয়ে উঠে না। আপনি স্কুলে প্রমিত বাংলা শেখানো বন্ধ কইয়া দিয়া দ্যাখেন, দশ বছর পরে এই ভাষা কয়জন বলে আর কয়জন বুঝে। আমরা আমাদের দরকারে যেমন প্রমিত ভাষা দাঁড় করাই, ঠিক তেমনি ভদ্রলোকদের মুখের জবানরে নিশানা বানাইয়া মাঝে-মধ্যে পুরানা প্রমিতকে সাফ-সুতরা কইরা নিই। এই হল কথা। 

আঞ্চলিক ভাষায় যদি আপনি কিছু লেখেন তাইলে কার লাইগা লেখবেন, সেটা হল আসল প্রশ্ন। যদি ঐ আঞ্চলিক ভাষার বলিয়েদের জন্য লেখেন তাইলে তো মামলা খালাস। কিন্তু আপনার প্রশ্নের ধরন দেইখা মনে হইতেছে, আপনি লিখবেন আঞ্চলিক ভাষায়, কিন্তু পড়াবেন মধ্যবিত্ত শহুরে শিক্ষিত শ্রেণীকে। মানে এমন পাঠককে যারা ঐ আঞ্চলিক ভাষা জানে না। যদি মামলাটা এমন হয়, তাহলে পাঠক অভিধান দেখবে। যেমন মধুসূদনের বা সুধীনদত্তের কবিতা পড়ার সময় দেখে। যদি লেখাটা মূল্যবান হয়, তাহলে লোকে কষ্ট করে হলেও পড়বে। এখানে খানিকটা গম্ভীর হয়ে পুরানা প্যাচালই পাড়তে হয় – আপনার বিষয় আর ভঙ্গি যদি আঞ্চলিক বুলি দাবি করে, তাহলে আপনি ঐ ‘অচিন’ শব্দই ব্যবহার করবেন। যার দরকার সে খুঁইজা নিব। আর যদি আপনি ফাও কামে এসব ‘আঞ্চলিক’ ঝামেলায় যান তাহলে লোকে পাত্তা দেবে না। 

কিন্তু এসব তো পুরানা কথা। খুব প্রচলিত ব্যাপার। একসময় – যেমন ওয়ালীউল¬াহ্ করেছেন – ছোটলোকদের সংলাপ বা কথাবার্তায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের জরুরত দেখা দিলে ভদ্রলোক লেখকেরা এমন এক আঞ্চলিক রূপ ব্যবহার করতেন, যা বাংলাভাষী সব অঞ্চলের লোক বুঝতে পারবে। অবশ্য বিষয়ের প্রয়োজনের দোহাই দিয়া এমনকি আলাউদ্দিন আল আজাদের মতো অনেক পুরানা লেখক আঞ্চলিক ভাষায় বর্ণনাংশও তৈরি করেছেন। আর এইকালের লেখক যেমন রাখাল রাহা পুরা বই লিখেছেন আঞ্চলিক ভাষায়। তারেক খান ‘বান্ধাল’-এর মতো ঢাউস উপন্যাস সামলাইয়া ফেলল ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক বুলিতে। সমস্যা হয়েছে বলে তো মনে হয় না। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে ‘দাবায়া রাখতে পারবা না’ বলেছেন; যদি পুরা ভাষণ নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় দিতেন, তাহলে কি খুব ভালো হত? আসলে প্রশ্নটা হওয়া উচিত এইরকম – কোনো বিশুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষায় কি এই ভাষণ হতে পারত? আমার তো ধারণা পারত না। কোনো অন্য রকম জনগোষ্ঠীর সামনে অন্য কোনো পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ আঞ্চলিক ভাষায় কোনো মহাকাব্যিক ভাষণ হতেও পারে। 

ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মূল কথা হল, যিনি ব্যবহার করছেন তিনি তাঁর ভোক্তাকে মানিয়ে নিতে পারছেন কিনা। এই যুক্তির বাইরে যাঁরা অন্য কিছু বলে তাদের কথায় কান দেয়া খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। 

তালাশ তালুকদারঃ মানভাষা কি শ্রেণীকরণ করে? অর্থাৎ মান ভাষা বুর্জোয়াশ্রেণীর ভাষা আর তৃণমূল লোকের ভাষা আঞ্চলিক ভাষা। এই বিভক্তিকরণ এ সম্পর্কে কিছু বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ মানভাষা তো শ্রেণীকরণ করেই। সমাজে শ্রেণী আছে বলেই তো মানভাষা জাতীয় কিছু আদৌ সম্ভব হয়। আর বিশ্বব্যাপী মানভাষার ধারণাই তো এই যে, সমাজের উঁচুতলার লোকের শব্দব্যবহারের ধরন, উচ্চারণের ধরন ও বাকভঙ্গি মানভাষা রূপে বিধিবদ্ধ হবে। সোজা করে বলা যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রে যে গোষ্ঠীর সিনার জোর যত বেশি তার ভাষাভঙ্গিরও ঐ রাষ্ট্রের মানভাষা হিসাবে গ্রাহ্য হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। ফলে বিষয়টা আলবত শ্রেণীর সাথে যুক্ত। 

কিন্তু কেউ যদি আবার শ্রেণীর সাথে মানভাষার ব্যাপারটিকে একাকার করে ফেলে তাহলে মুসিবত। কথা সহজ। চাঁটগাঁর সবচেয়ে ধনী লোকও সম্ভবত তার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। আবার নদীয়া-শান্তিপুরের সবচেয়ে গরীব মানুষটিও হয়ত আমার চেয়ে ভালো ‘প্রমিত’ উচ্চারণ করে। আমি নোয়াখালীর চর থেকে আসা মানুষ। প্রমিত উচ্চারণ আর কদ্দুর এস্তেমাল করতে পারব? 

একারণেই শ্রেণীর সাথে ভাষাকে একাকার করে ফেললে চলবে না। যার সঙ্গতি আছে সে হয়ত শিক্ষার বদৌলতে বা সোহবতের গুণে মানভাষা রপ্ত করেই ফেলল। কিন্তু ভাবুন একবার – বাংলাদেশের পুবদিকের জেলাগুলোর মানুষের তুলনায় পশ্চিমদিকের মানুষেরা বর্তমান ‘মানবাংলা’ রপ্ত করার ক্ষেত্রে কত বেশি সুবিধা পায়। সুতরাং খুব সরল অংকের সুযোগ নাই। 

তালাশ তালুকদারঃ প্রমথ চৌধুরী জানিয়েছেন, গ্রীক সাহিত্য ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মতে ইহজগতের সর্বশ্রেষ্ট। কিন্তু এ অপূর্ব সাহিত্য কোনোরূপ মান ভাষায় লেখা হয নাই। ডায়ালেক্টেই লেখা হয়েছে। গ্রীক সাহিত্য একটি নয় তিনটি ডায়ালেক্টে লেখা। এখানেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মুখের ভাষায় ‘বড়ো সাহিত্য গড়া’ চলে। আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যেও মৌখিক ভাষার অনুসারেই লেখা হযে থাকে। ‘মুদ্রিত সাহিত্যে’র ভাষায় লেখা হয় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও যত ‘উৎকৃষ্ট মানের রচনা’ দু’একটি ব্যতিক্রম বাদে অধিকাংশই আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। এ সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ আপনার কথার সাথে একেবারেই একমত নই। যে ‘আঞ্চলিক ভাষা’য় বিশ্বমান্য সাহিত্য লেখা হয়, তা আর ‘আঞ্চলিক’ থাকতেই পারে না। গ্রিসে তিনটি ‘আঞ্চলিকে’ সাহিত্য রচিত হওয়ার কারণ – ওখানে একটি রাষ্ট্র ছিল না। ফলে একহারা কোনো ‘মানভাষা’ গড়ে উঠার সুযোগও ছিল না।  সত্য বলতে কি, এ আলোচনায় যাওয়ার আগে ‘আঞ্চলিক’ ভাষা বলতে কী বুঝব, তা ঠিক করে নিতে হবে। তার এক প্রমাণ এই যে, আপনার মতে বাংলাদেশের ‘উন্নত’ সাহিত্যসকল আঞ্চলিক ভাষায় লেখা। কিন্তু আমি তো দুই-একটার বেশি ধর্তব্য সাহিত্যকর্মই পাই না, যা আঞ্চলিক ভাষায় লেখা হয়েছে। ফলে কথা বলার আগে কী নিয়ে বলছি, তা ঠিক করে নেয়া দরকার। 

আর প্রমথ চৌধুরীর ব্যাপারে খুব সাবধান থাকা দরকার। প্রমথ চৌধুরী কিন্তু চলতি ভাষার পক্ষে ওকালতি করেননি, করেছেন চলিত ভাষার পক্ষে। তাঁর ভাষার রকমারি গুণ; কিন্তু এ বস্তু মুখের ভাষা নয়। তিনি তাঁর নিজের প্রকল্পের পক্ষে নানান ধরনের যুক্তিতর্ক করেছেন এবং প্রতিপক্ষকে আচ্ছা রকমে শায়েস্তা করেছেন। এতে বাংলা গদ্যের হয়ত ক্ষতি হয়নি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাঁর ঐ সময়ের সব যুক্তিতর্ক বিনা বিচারে একালে ব্যবহার করা লাভজনক না-ও হতে পারে। 

তালাশ তালুকদারঃ ৪৭’ পরবর্তী ভাষা নিয়ে বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ সাতচলি¬শের পরে পশ্চিমবাংলার বাংলা ভাষা নানা ধরনের চাপে পড়েছে। এর মধ্যে আছে ইংরেজি ও হিন্দির চাপ, আছে রাষ্ট্রযন্ত্র, উৎপাদনসম্পর্ক আর সচ্ছল মধ্যবিত্তের অন্দরে না ঢুকতে পারার চাপ। এর ফলে ওখানে বাংলা ভাষার প্রগতিশীলতার সম্ভাবনা কমেছে বলেই মনে করি। 

ভাষার প্রগতিশীলতা বলতে আমি কী বুঝি তা খোলাসা করে বলা দরকার। এক নম্বরে, মুখের ভাষার সাথে প্রতিনিয়ত আপসরফা করে প্রাণবান আর গতিশীল থাকা। নতুন ধারণা প্রকাশ করার জন্য ভাষার বিপুল কথ্যভাণ্ডারে নিয়মিত তল্লাসি চালানো, আর বিপরীতে কথ্য দুনিয়ার শব্দে নতুন ভাবের মুখোমুখী হয়ে তাজিমের সাথে সেই ভাব আর সংশ্লিষ্ট ভাষাভঙ্গি আত্মসাৎ করে নেয়া। দুই নম্বর, ক্ষমতা-সম্পর্কের উঁচা জায়গাগুলাতে হান্দাইয়া যাওয়া। এইরকম জায়গা আছে মোটামুটি তিনটা। প্রশাসন, আদালত আর উচ্চশিক্ষা। 

এসব কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে খুব একটা জ্ঞানগম্যি না থাকলেও বোঝা যাবে যে, বাংলা ভাষার প্রগতির সম্ভাবনা বাংলাদেশেই বেশি। কিন্তু তা হয়ে উঠে নাই। কেন? কারণ, পাকিস্তান রাষ্ট্র ও সংশি¬ষ্ট ‘পাকিস্তানি বাংলা’ বলে এক জগাখিচুড়ি ফলিয়ে তোলার ব্যাপারে একটা সময়ের চেষ্টা। সেই চেষ্টা বোধগম্য কারণেই ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু তার ভূত আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা সংক্রান্ত বিপুল আলোচনায় আমি এ লক্ষণ দেখেছি। ফলে বাংলাদেশে বাংলা ভাষার কাঙ্ক্ষিত প্রগতি সম্ভবপর হয় নাই। আমি পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশের অনেক ভাষ্যকারের লেখায় এ ধরনের মন্তব্য পড়েছি যে, বাংলাদেশের বাংলাচর্চা পশ্চিমবাংলার তুলনায় অনেক রক্ষণশীল। এমনকি পত্রপত্রিকার ভাষাও। 

এখানে একটা কথা বলে রাখি। পশ্চিমবাংলার বাংলা মরে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশের বাংলা বেশ তাজা আছে – এ ধরনের মন্তব্যে বাংলাদেশের কোনো কোনো পণ্ডিতকে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে দেখি। এর কোনো বাস্তবতা আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা ঠিক, বাংলাদেশের বাংলায় প্রাণশক্তি আর বৈচিত্র্য পশ্চিমবাংলার তুলনায় বেশি। কিন্তু যুক্তিশীলতার চর্চা আর জ্ঞানচর্চাকে ভাষায় বাগ মানানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চর্চা তো পশ্চিমবাংলার সাথে এক পাল¬ায় উঠতেই পারবে না। ভাষার ক্ষেত্রে ‘প্রগতিশীল’ চর্চায় আগুয়ান হতে পারলে বাংলাদেশের বাংলা বোধ করি পশ্চিম বাংলার বাংলার জন্যও কিছু সারবস্তুর যোগান দিতে পারত। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ আজতক দেখা যায়নি। 

আরেকটা কথা। একটু আগে ভাষার ‘প্রগতিশীলতা’ বলে যে বাতচিত করলাম, তা আমি আমার মতো করে শিখেছি দেবেশ রায়ের কাছ থেকে। বাংলা ভাষার ইতিহাস, বর্তমান চর্চা আর ভবিষ্যত সম্ভাবনা সম্পর্কে তাঁর মতো কামেল মানুষ আমি আর দেখি না। 

তালাশ তালুকদারঃ আমরা জানি, বাঙলা ভাষা-অঞ্চল দু’ভাগে বিভক্ত। উনিশশো সাতচল্লিশ-পূর্ব উভয়-অঞ্চলে এবং এর সাতচল্লিশ পরবর্তী অঞ্চলের ভাষা। হুমায়ুন আজাদ জানিয়েছেন, সাতচল্লিশ-পূর্ব বঙ্গীয় সমস্ত কিছুই আমাদের ঐতিহ্য এবং সমস্তকিছুরই আমরা স্বত্বাধিকারী; কিন্তু সাতচল্লিশোত্তর সমস্ত কিছুই দ্বিধাবিভক্ত কিনা এ সম্পর্কে কিছু বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ এ প্রশ্নের বিষয়ে আগের উত্তরেই যথেষ্ট বলেছি। শুধু একটা কথা। ঐতিহ্য বলে একটা জিনিস ঠিক করে নিয়ে তারপর কর্মপন্থা ঠিক করা বা সে অনুপাতে কোনো কিছুকে জায়েজ-নাজায়েজ বলে সাব্যস্ত করা চিন্তার এক ক্ষতিকর গলদ। কাজকাম বা জরুরতের নিরিখে নীতি-আদর্শ বা ভালো-মন্দ ঠিক না করে পয়লা ভালোমন্দ ঠিক করে তারপর কাজের দিকে যাওয়া, মানে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া – এটা একটা ঔপনিবেশিক খাসলত। বলা দরকার, অন্য অনেক কিছুর মতো ভাষার বিকাশের জন্যও এটা বিরাট অন্তরায়। কে কোনখান থেকে নিবে তা না বলে বলা উচিত, যা দরকার হবে তা-ই নিবে। আর সাতচলি¬শোত্তর সব কিছু দ্বিধাবিভক্ত কিনা তা বলার আমি কে বা অমুক কে? কোনো বিশেষ ব্যাপারে সুস্পষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কেবল এই আলাপ চলতে পারে – কোনো গড় মন্তব্য সম্ভব না। একটা উদাহরণ দিই। দেবেশ রায় তো সাতচলি¬শের পরের জমানার মানুষ। তাহলে এই লোক কি আমার ঐতিহ্যের মধ্যে পড়বে না? আসলে ঐতিহ্য-টৈতিহ্যকেন্দ্রিক চিন্তার এই প্রক্রিয়াটা গোলমেলে শুধু নয়, ক্ষতিকরও বটে।  

তালাশ তালুকদারঃ এখন ভাষা নিয়েও নানান বুর্জোয়া রাজনীতি চলছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বাঙালি আর বাঙলাদেশি জাতীয়তাবাদ। উল্লেখ্য, ‘মানভাষার বাইরে কিছু করা যাবে না’ এ কথা যখন বাংলা একাডেমি কর্তৃক ঘোষণা করা হয় তখন এটাকে কী বলবেন? এই যে চাপিয়ে দেয়া, জনগণকে বাধ্য করা, এটা কি ফ্যাসিস্টরূপ নয়? এ বিষয়ে কিছু বলুন?

মোহাম্মাদ আজমঃ বাংলাদেশে আপনি ‘বুর্জোয়া’ রাজনীতির চর্চা দেখতে পেয়েছেন শুনে মনটা ভালো হয়ে গেল। আমি পাতি-বুর্জোয়ার বাইরে কিছু কখনো দেখি নাই। এইটা আমার ব্যর্থতা হইতে পারে। ভাষা নিয়া বুর্জোয়া রাজনীতি যদি চলত তাহলে ভালোই তো হত। কারণ, বুর্জোয়া তার নিজের মূর্তি খুঁজবে এবং খাড়া করবে। মূর্তি প্রণয়নের জন্য ভাষার চেয়ে বড় হাতিয়ার আর কী হতে পারে? বাংলাদেশে যারা মালপানি কামাইছে তারা ভাষার দিকে নজর দেয়ার সময় পায় নাই। বোধ হয়, মুফতে মাল কামাইতে বেশি সময় না লাগলেও খরচা করতে বেশ সময় লাগে। আমি জানি না। আমি কামাইছি খুবই কম, তাই খরচ করার সুযোগও বিশেষ জোটেনি। তো, আমার মতো ‘শিক্ষিত’ ভদ্রলোকরা ভাষার ব্যাপারে বেশ বাক্যব্যয় করেন – দেখতে পাই। এই বাক্যব্যয় খারাপ না। কিন্তু তাঁরা ভাষার ‘মান’ নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজেকে বা নিজেদেরকে বিশেষ আমলে এনেছেন বলে তো মনে হয় না। তাঁরা অন্যের বরাত দিয়েছেন, অন্য সময়ের কথা বলেছেন, কেউ কেউ অন্য স্থানের কথাও বলেছেন। এই ব্যাপারটা ভাষার জন্য হয়ত ভালোই – আমি ঠিক নিশ্চিত নই। কিন্তু এ যে বুর্জোয়া আচরণ নয়, এ কথা হলফ করে বলতে পারি। 

এ দিক থেকে একেবারে খাঁটি বুর্জোয়া ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর অতি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাবিষয়ক রচনাতে তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি কিন্তু আমার ভাষা নিয়া কথা বলতেছি’। নিশ্চয়ই তিনি এভাবে বলেননি, বা আক্ষরিক অর্থে এ কথা বলেননি; কিন্তু ভাবগতভাবে কথাগুলোর মানে এই-ই দাঁড়ায়। হুমায়ুন আজাদের মধ্যেও নিশ্চয় এক বুর্জোয়া আত্মা ভর করেছিল ঐ সময়, যখন তিনি ঢাকার এক উচ্চারণ অভিধান আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, যে অভিধানে আমার উচ্চারণ নাই, সেটা আমার উচ্চারণ-অভিধান হতেই পারে না। 

বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক যখন এই মন্তব্য করেছিলেন, তখন তিনি নিশ্চয় বাংলা একাডেমীর সিদ্ধান্ত হিসাবে তা বলেননি। অন্তত এরকম কোনো সভার কথা তো তখন শুনিনি। তিনি নিশ্চয়ই বাংলা-ইংরেজি মেশানো খিঁচুড়ি ভাষা নিয়া উদ্বিগ্ন বোধ করছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি ভাষার ব্যবহারিক নিয়ন্ত্রণ আরোপের মতো কোনো অসম্ভব কর্মসূচির কথা মাথায় রেখে কথাগুলো বলেননি। অন্তত, আমি তাঁর কথাকে আক্ষরিক অর্থে নিইনি। তবে কথাটা –আপনি ঠিকই বলেছেন – ভাষার ক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট উচ্চারণের মতোই মনে হয়েছিল। 

তালাশ তালুকদারঃ আমাদের মান ভাষারূপ কেমন হবে? আমরা কি রাবীন্দ্রিক যুগেই থাকব? নাকি সরকার নিয়ন্ত্রিত একটা জাতকুল-বজায়-রাখা আর্টিফিসিয়াল ভাষাই থাকবে? নাকি আমাদের এই জনপদের সাথে মিশ খাওয়া, ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা, ধর্ম-সংস্কৃতির ভিতর থেকে গড়ে উঠা আলাদা একটা মিশ্র ভাষার সাধনা করব আমরা?

মোহাম্মাদ আজমঃ আমরা রবীন্দ্রনাথের ভাষার জায়গায় আসলে নাই। রবীন্দ্রনাথের নাম নানা পক্ষ মর্জি ও মওকামাফিক ব্যবহার করে মাত্র। আর আমরা মিশ্রভাষার সাধনাও করব না। আমি আগেই বলেছি, মিশ্রভাষার ধারণা ভাষার ক্ষেত্রে সমস্যাপূর্ণ, যেমন সমস্যাপূর্ণ ভাষার শুদ্ধতার ধারণা। 

বর্তমানে চালু ‘মানভাষা’র বিরোধিতা করতে গিয়ে অনেকে ‘মানভাষা’র ধারণারই বিরোধিতা করেন। ভাষার ব্যবহারজনিত ব্যাপকতা সম্পর্কে কাণ্ডজ্ঞানহীনতাই এই বিরোধিতার কারণ। রাষ্ট্র একটি বিরাট কাঠামো, এর ভিতরে আছে আরো বহু ধরনের কাঠামো আর সামষ্টিকতা। মানে দশের কারবার। দশের কারবারের জন্য দরকার সেই ভাষা যাতে দশের সম্মতি আছে। এই বস্তুর নামই ‘মানভাষা’। এই নামে আপত্তি থাকলে একে আপনি অন্য নামেও ডাকতে পারেন।

আমাদের একটা মুশকিল হল, ভাষার কারবার বলতে আমরা আজও প্রধানত সাহিত্য বুঝি। এই ব্যারাম বাঙালির মধ্যে ভর করেছিল উপনিবেশ আমলে – উপনিবেশিতের খাসলত অনুযায়ী। রাষ্ট্র চালানোর মুরোদ নাই যাদের, তারা তো শিল্পসাহিত্যই করবে। শ্যামাচরণ গাঙ্গুলি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, আর অনেকাংশে রবীন্দ্রনাথ – এই কয়জনকে পাই, যাঁরা বুঝতেন, সাহিত্য ভাষার একটা ছোট্ট দিক মাত্র। জনশিক্ষা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত অসংখ্য সামষ্টিক কাজকে – যার সাথে সমস্ত মানুষ জড়িত – পাত্তা না দিয়ে সাহিত্যচর্চাকে ভাষা-সম্পর্কিত বিবেচনার কেন্দ্রে স্থান দেয়া কেবল আহাম্মকি নয়, বেয়াদবিও বটে। ঢাকায় আজকাল যে ছড়ানো-ছিটানো ভাষা-বিতর্ক চলছে, তাতে ঐ একই লক্ষণ দেখে ভয়ও জাগে, হতাশও হই। 

আমাদের চালু ‘প্রমিত’ বাংলার সমস্যা গোটা তিনেক। এক. ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার কারণে মানভাষা নির্ধারণের ক্রমটি একেবারে উলটে গিয়েছিল। মুখ থেকে কলমে না এসে ভাষা কলম থেকে মুখে এসেছিল। ফলে প্রথম থেকেই জনবিচ্ছিন্নতার বাড়তি চাপ একে পুষ্টির অভাবে ফেলেছে। দুই. এই ‘প্রমিত’ স্থির করা হয়েছিল কলকাতায়, এবং কলকাতার ভাষাকে কেন্দ্র করে। ঐ বস্তু ঢাকায় স্রেফ উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। কলকাতায় বাংলার সমৃদ্ধ চর্চা হয়েছে। এর কায়দা-কানুনও যথাসম্ভব বিধিবদ্ধ হয়েছে। সেগুলোকে সাধ্যমতো কাজে লাগিয়ে পূর্ব বাংলার ভাষার স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে পাত্তা দিয়ে ‘প্রমিত’ ভাষায় সম্মতির হার বাড়ানো যেত। কিন্তু তা হয় নাই। এখানে একটা কথা উলে¬খ করা দরকার – পূর্ব বাংলার ভাষার, মানে বাঙ্গালদের ভাষার, বহু পৃথক বৈশিষ্ট্যের উলে¬খ রবীন্দ্রনাথসহ বিভাগপূর্ব অনেক লেখকের লেখায় অনবরত পাই। পূর্ব বাংলার ভাষার ব্যাপারটি মোটেই সাতচলি¬শ পরবর্তী আবিষ্কার নয়। তিন. একটা খুব বাজে ধারণা এখানে অনেকের মধ্যে চালু আছে যে, ভাষা একবার বিধিবদ্ধ হলে তার পবিত্রতা রক্ষা করতে হয়। এই চিন্তা থেকে ভাষাকে ধরে-বেঁধে রাখার একটা খায়েশ দেখি অনেকের মধ্যে। ভাষা সম্পর্কে যার প্রাথমিক জ্ঞান আছে, সেই বুঝবে, এটা কত বড় আহাম্মকি। 

ঢাকার ‘প্রমিত’ বা ‘মান’ বাংলার আলোচনায় এই তিন সমস্যার কথা মনে রাখলে আলাপে গতি আসবে, বিরোধ-স্ববিরোধ কমবে, আর ভাষা কাজ-চালানোর মতো করে বিধিবদ্ধ করার কামটাও জোর-কদম আগাবে। 

তালাশ তালুকদারঃ আপনি কোন ভাষার পক্ষে?

মোহাম্মাদ আজমঃ আমি কোনো ভাষারই পক্ষে না। এমনকি বাংলা ভাষারও পক্ষে না। আমাকে যদি কেউ যুক্তি দিয়ে, হিসাব কষে, ছক এঁকে বুঝিয়ে দিতে পারে – বাংলাদেশের সব মানুষকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত করা সম্ভব, তাহলে আমি ইংরেজির পক্ষে চলে যাব। কারণ, তাতে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের মানুষ অনেক বেশি সুবিধা পাবে। তা সম্ভব না বলেই বাংলায় শিক্ষা আর অন্য কায়কারবার চালানোর জন্য প্রচারণা চালাই। 


বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গা হল, আবেগে ভর করেই আমরা বাংলার প্রতি দায়িত্ব শেষ করছি। বাংলার পক্ষে যুক্তি তৈরি করিনি। ফলে একটা আস্ত ‘রাষ্ট্রভাষা’ আন্দোলন আমাদের চোখের সামনে ‘মাতৃভাষা আন্দোলন’ হয়ে উঠল – আমরা বিশেষ উচ্চবাচ্য করলাম না। কারণ, মাতৃভাষা কথাটার সাথে আবেগের যোগ বেশি। আমাদের ইংরেজি-মাধ্যম পড়াশোনা আর মাতৃভাষার প্রতি আবেগ সমানতালে চলতে পারে। কোনো বিরোধ তৈরি হয় না। এদেশের সুবিধাভোগী শ্রেণির এটা সজ্ঞান বা অজ্ঞান প্রবণতা। এতে বিদ্যমান কাঠামো ঠিক থাকে; দেশপ্রেম, ভাষাপ্রেম আর শ্রেণিস্বার্থ একসাথে রক্ষিত হয়। 

বাংলাদেশে যারা গত চার দশক ধরে বাংলাভাষার শুদ্ধতা রক্ষা ও আরো নানান নামে ভাষাপ্রেম দেখিয়ে আসছে, তাদের আন্তরিকতায় সন্দেহ করার ঘোরতর কারণ আছে। দেখতেই পাচ্ছি, এরা এই দেশের প্রভাবশালী অংশ। চাইলে বাংলার সার্বজনীন ব্যবহার নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়া এদের পক্ষে সম্ভব। কিন্তু অফিস-আদালত, শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষায় বাংলা চালুর কার্যকর উদ্যোগ-আয়োজন কই? সন্দেহ করার কারণ আছে, এইসব কাজের উদ্যোগ না নেয়ার যে পাপ, তা মোচনের জন্যই ‘ভাষার শুদ্ধতা’ রক্ষার উপর বাড়তি – কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাষাতত্ত্ব-অসম্মত – জোর দেয়া হচ্ছে। আসল কাজ কিছু কিছু হলে এই নকল কাজের উপর এত চাপ পড়ত না। 

ভাষার ব্যাপারে আমার পক্ষপাত যদি জানতেই চান, তো বলব, ভাষাকে আমি গণতান্ত্রিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অস্ত্র মনে করি। মানে একে প্রধান অস্ত্র করে তোলা যায়। এর প্রথম দিক জনশিক্ষা। পরের ধাপ বাংলার সর্বাঙ্গীণ ব্যবহার – যাতে বিভাষায় হোঁচট খেয়ে বিপুল মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে নিজেকে এক্সক্লুডেড মনে না করে। বুঝতেই পারতেছেন, এগুলো রাজনৈতিক কারবার, ‘প্রেমমূলক’ ব্যাপার নয়। ‘প্রমিত’ ভাষার মামলাও আমার কাছে এই মামলার আরেক মুখ বৈ নয়। এমন প্রমিত চাই, যাতে সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি মানুষের অংশগ্রহণ থাকবে। তথাকথিত আঞ্চলিক ভাষাভাষী মানুষেরা ভদ্রলোকী ভাষার মধ্যে নিজেদের অংশ আবিষ্কার করে আশ্বস্ত হবে। নিজেকে এর অংশ মনে করবে। আর ভাষার প্রমিতকরণ হবে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া – একবার হয়ে যাওয়ার পর কেতাব-কোরানের মতো শুদ্ধতা রক্ষার উপাদান নয়। ভাষার শুদ্ধ-রূপ চাই না। চাই দশের অংশগ্রহণে তৈরি হওয়া দশের মেনে-নেয়া রূপ। চাই গণতান্ত্রিকতা। 

যুক্তির জায়গায় আবেগ, উপযোগিতার জায়গায় ঐতিহ্য, সর্বাঙ্গীণ ব্যবহারের তুলনায় সাহিত্যিক এলিট রূপের প্রাধান্য – এই তিনটি বাংলার প্রধান শত্রু। এই তিন শত্রুমুক্ত ভাষাপরিস্থিতি চাই।

(বি: দ্র: প্রকাশিত হয়েছিল: তালাশ তালুকদার সম্পাদিত কীর্তিকলাপ.কম এ।)



মন্তব্যসমূহ