পাঠক তৈরি করে কারা? ।। তালাশ তালুকদার
পাঠক তৈরি করে কে? এই প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি বলতে হয় পাঠক তৈরি করার পিছনে মূলত কাজ করে মিডিয়া। তাহলে বলতে হয়, এই মিডিয়া কি মিডিয়ার স্বার্থে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করেনা? হ্যাঁ করে। এই মিডিয়াগুলো আবার প্রত্যেক এজেন্সি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
যেসব এজেন্সিগুলো বাংলাদেশে মিডিয়া হিসেবে কাজ করে, সেগুলো কি শুধুমাত্র দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক পত্রিকা, মাসিক, ত্রৈমাসিক, কিংবা লিটলম্যাগ? কিংবা ইলেক্ট্রনিক্স চ্যানেলগুলো? হ্যাঁ, এগুলো মিডিয়ার প্রকাশ্যরূপ। এর বাইরেও বিভিন্ন এজেন্সির হয়ে পরোক্ষভাবে কাজ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো। নিজেদের ঘরানার কবি সাহিত্যিকদের এরাও পরোক্ষভাবে প্রমোট করে থাকে। বিভিন্ন এজেন্সির হয়ে ভেতরে ভেতরে কাজ করে আরো অনেকপ্রকারের কালচারাল অর্গানাইজেশনগুলোও। এদের লক্ষ্যই থাকে নিজেদের মতাদর্শের কবি সাহিত্যিকদের বিভিন্ন কায়দায় পাঠকদের সামনে হাজির করা। যে দেশে যে এজেন্সিগুলো স্ট্রং সেদেশে সে সে মতাদর্শের কবি সাহিত্যিকরাও বেশি উপস্থিতিও লক্ষ্যনীয়। বাংলাদেশে ভারত তথা কলকাতা এজেন্সিদের প্রভাব দেখা যায়। একারণে দেখা যাবে, পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ওয়ার্কসপ, কিংবা সেমিনারে ভারতীয় মতবাদের পক্ষের সাহিত্যিকদের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয় পর্যায়ে থাকে।
এইসব এজেন্সিগুলা যা খাওয়ায় পাঠককে, পাঠকেরা তা খেয়ে লাফালাফি করে। পাঠকদের জাজমেন্টের দৌড় এজেন্সিগুলোর ঐ বাতলে দেওয়া নাম পর্যন্তই। ফলে, কবিতা বিচার পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলে তা বুমেরাং হয়ে যায়। ষাট, সত্তর, আশির অনেক গুরুত্বপূর্ন কবি এভাবে আড়ালে থেকে গেছে। আর মিডিয়ার তৈরি করা দুর্বল কবিরাই চেয়ার পেতে সামনের কাতারে বসে থাকে। ফলে, সাধারণ পাঠকেরা বুঝে নেয়, আসল কবি বুঝি এরাই।
যারা কবিতা লেখে তারা কবি, একথা মান্য তবে কবিতার স্ট্যান্ডার্ড বিচারে আসলে তারা কতটা উত্তীর্ণ সে বিচারটাও জরুরি। মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, অসীম সাহা, হেলাল হাফিজদের বিপরীতে আমরা কয়জন আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান, সিকদার আমিনুল হক, মোহাম্মাদ রফিক, রফিক আজাদ, মুস্তফা আনোয়ার, আবিদ আজাদদের নাম জানি। সেইদিক থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কপাল ভাল। সম্ভবত তসলিমা নাসরিনের সাথে জুটি বেঁধে কবিতা না লিখলে সেও কি সামনের কাতারে থাকতো? কেননা এই ঘটনাও বাংলা সাহিত্য সমাজে মিথ আকারেই হাজির করানো হয়েছে।
আশির পরে বর্তমান সময়ে এই জনপ্রিয় কবির তালিকায় এজেন্সীগুলো পাঠকদের সামনে নাম ধরায়া দিচ্ছেন, মারজুক রাসেল, ইমতিয়াজ মাহমুদ কিংবা সাদাত হোসাইনদের নাম। আমরাও পাঠকরাও তাদের নিয়েই হৈচৈ করছি। শুধু পাঠকদের দোষ দিয়ে লাভ কি? সিন্ডিকেটভুক্ত কবিরাও তার পিছে পিছে দৌড়াচ্ছি। হায়, আমাদের বিবেচনাবোধ!
দোষটা সিরিয়াসধারার লেখকদের ওপরেও বর্তায়। আমরাও কি ভাল ভাল কবিতাগুলা পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছি? পারিনি। ভাল কবিতা, ভাল কাব্যগ্রন্থগুলো আড়ালেই রেখে দিয়েছি। আমাদের এমন কৃপণতাই আমাদেরকে জনপ্রিয়দের তালিকা থেকে আড়াল করেছে। ওদিকে হুমায়ুন আহমেদ ঠিকই সময় সুযোগ পেলে ইমদাদুল হক মিলনের নাম নিয়েছে। আনিসুল হকরা তার মতই কাউকে নেয়। শ্রীজাত নেয় ইমতিয়াজের নাম। আর আমরা আমাদের নিজেরাই নিজেদের ভুলে থাকি। ভাবি, ভবিষ্যতে এমন কোনো পাঠক আমাদেরকে আবিস্কার করে ঠিক ঠিকই পড়ে ফেলবে। কেমন ভ্রান্ত চিন্তা নিয়ে আমরা দিনশেষে নিজেদেরকেই বিস্মৃত করে তুলছি।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন